Home ক্রাইম ‘হুজি-বির প্রতিষ্ঠাতা’ ১৭ বছর প্রকাশ্যে থেকেও ছিলেন অধরা

‘হুজি-বির প্রতিষ্ঠাতা’ ১৭ বছর প্রকাশ্যে থেকেও ছিলেন অধরা

রমনায় বোমা হামলা মামলায় গ্রেপ্তার ফাঁসির আসামি আব্দুল হাই

বাংলাদেশ পোষ্ট ২৪ ডটকম: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ৭৬ কেজি বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হত্যাচেষ্টা মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলা নেতা মুফতি আবদুল হাই কেবল নিজের পরিচয় পাল্টে কাটিয়ে দিয়েছেন ১৭ বছর।

আবদুল হাই হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বলে জানিয়েছে র‌্যাব। ৯০ দশকের শুরুতে বিএনপির শাসনামলে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে সংগঠনের যাত্রা শুরু করেন। প্রশিক্ষণ শিবির স্থাপন করেন কক্সবাজারের উখিয়ায়।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া এই জঙ্গি নেতা আত্মগোপনে থাকার সময় তিনি প্রথমে কয়েক বছর কাটান কুমিল্লার গৌরীপুরে শ্বশুরবাড়িতে। পরে ফিরে আসেন নারায়ণগঞ্জে নিজের এলাকায়। এলাকায় এসে নিজের এবং পরিবারের সবার নাম পাল্টে ফেলেন। এভাবেই দিব্যি কাটিয়ে দেন জঙ্গি নেতা আবদুল হাই।

বুধবার রাতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকায় সেই বাসা থেকেই ধরা পড়েছেন আবদুল হাই। তাকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-২-এর একটি দল।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানান বাহিনীটির লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক খন্দকার আল মঈন।

তিনি জানান, ২০০০ সালে গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় ৭৬ কেজি বোমা পুঁতে রাখার ঘটনা ছাড়াও একই বছর রাজধানীর রমনায় বোমা হামলা মামলার আসামি ছিলেন আবদুল হাই। তিনি দুই মামলাতেই মৃত্যুদণ্ড পাওয়া। ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড হামলা এবং পরের বছর হবিগঞ্জে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এস এম কিবরিয়ার ওপর গ্রেনেড হামলায়ও জড়িত ছিলেন।

র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, সাজা মাথায় নিয়ে নানা কৌশলে নিজের ও পরিবারের সবার পরিচয় পরিবর্তন করে ১৭ বছর প্রকাশ্যেই ছিলেন আবদুল হাই।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিভিন্ন জঙ্গি হামলার ঘটনায় তার সঙ্গে হুজি-বির সম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে ২০০৬ সালের পর আত্মগোপনে চলে যান আবদুল হাই। এর আগ পর্যন্ত তিনি নারায়ণগঞ্জেই থাকতেন। তবে পরে তিনি কুমিল্লার গৌরীপুরে শ্বশুরবাড়িতে চলে যান।

গৌরীপুর বাজারে তার শ্বশুরের কেরোসিন ও সয়াবিন তেলের ডিলারশিপের ব্যবসা ছিল। তিনি সারা দিন ব্যবসা দেখাশোনা করে ওই দোকানেই রাত কাটাতেন। এভাবেই ২০০৯ সাল পর্যন্ত তার শ্বশুরবাড়ি এলাকায় ছিলেন।

গৌরীপুরে থাকা থাকাবস্থায় তিনি মাঝেমধ্যে গোপনে নারায়ণগঞ্জে যাতায়াত করতেন। পরে পরিবারের সবার ঠিকানা পরিবর্তন করে নারায়ণগঞ্জে ভোটার হয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

এলাকাবাসী যেন তার পরিচয় জানতে না পারেন সে জন্য ঘর থেকে খুব কম বের হতেন হাই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে তার বাসাটিকে এলাকার লোকজনের কাছে তার বড় ছেলের বাসা হিসেবেই পরিচিতি করান। সেই বাসা থেকেই গ্রেপ্তার করা হয় তাকে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আব্দুল হাই ‘হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশে’র-হুজি-বি-এর প্রতিষ্ঠাতা আমির। ১৯৯২ সালে কক্সবাজারের উখিয়ায় প্রশিক্ষণ ক্যাম্পও চালু করেন তিনি। সে সময় ক্ষমতায় ছিল বিএনপি।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলে যৌথ বাহিনীর অভিযানে ওই ক্যাম্প থেকে ৪১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রশিক্ষণ শিবিরটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্ষিপ্ত হন আবদুল হাই। এরপর ২০০০ সালে প্রধানমন্ত্রীকে হত্যাচেষ্টা, ২০০১ সালে রমনা বটমূলে বোমা হামলা, ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড হামলা এবং পরের বছর হবিগঞ্জে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এস এম কিবরিয়ার ওপর গ্রেনেড হামলায় জড়ান তিনি।

র‌্যাব কমান্ডার বলেন, ২০০০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কোটালীপাড়ায় জনসভার অদূরে জঙ্গি মুফতি আবদুল হাইসহ তার সঙ্গী জঙ্গি সদস্যরা ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখেন। এ ঘটনায় করা মামলায় ২০১৮ সালের ৩০ আগস্ট মুফতি হাইসহ ১০ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও চারজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়।

২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় ২০১৪ সালের ২৩ জুন হাইসহ ৮ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৬ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় আদালত।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে গ্রেনেড হামলায় ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও হাইসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় আদালত।

২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জ সদরে বৈদ্যের বাজারে জঙ্গিরা গ্রেনেড হামলা চালিয়ে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াসহ পাঁচজনকে হত্যা ও শতাধিক মানুষকে আহত করার মামলায়ও হাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা ১৩টি। এর মধ্যে দুটিতে মৃত্যুদণ্ড ও দুটিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা হয়েছে।

খন্দকার আল মঈন জানান, আবদুল হাই নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ মাদ্রাসায় ১৯৭২ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত হেফজ বিভাগে পড়ালেখা করেন। ১৯৮১ সালে অবৈধভাবে ভারতে গিয়ে দেওবন্দ দারুল উলুম মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ১৯৮৫ সালে সেখানে সর্বোচ্চ সনদ দাওরায়ে হাদিস পান।

ওই বছরের শেষ দিকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে পাসপোর্ট তৈরি করে বাংলাদেশে আসেন, পরের বছর ভারত ফিরে যান।

সেখান থেকে পাকিস্তানি ভিসা নিয়ে পাকিস্তানের করাচিতে গিয়ে একটি মাদ্রাসা থেকে দুই বছরের ইফতা কোর্স করে মুফতি টাইটেল অর্জন করেন আবদুল হাই। ১৯৮৯ সালে ওই মাদ্রাসায় একাধিক বাংলাদেশিসহ বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি মিরানশাহ সীমানা দিয়ে আফগানিস্তানে যান তালেবানের পক্ষে যুদ্ধ করতে।

আফগানিস্তানে থাকার সময়ই জঙ্গি সংগঠন ‘হুজি-বি’ প্রতিষ্ঠা করেন আবদুল হাই। ১৯৯১ সালে ফিরে আসেন দেশে। ওই বছরই জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে সংগঠনের যাত্রা শুরু করেন।

১৯৯২ সালের প্রথম দিকে আবদুল হাই কক্সবাজারের উখিয়ার একটি মাদ্রাসায় গিয়ে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প চালু করেন। পার্শ্ববর্তী দেশের এক জঙ্গি নেতা ওই ট্রেনিং ক্যাম্পে অস্ত্র সরবরাহ করতেন এবং মুফতি আবদুল হাই ও তার দুই সহযোগী সেখানে প্রশিক্ষণ দিতেন। ১৯৯৬ সালে যৌথ বাহিনীর অভিযানে ওই ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে ৪১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সে সময় মুফতি হাই ‘জাগো মুজাহিদ’ নামে একটি মাসিক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। পত্রিকাটি ১৯৯১ সালে চালু হয়। অফিস ছিল খিলগাঁওয়ের তালতলা এলাকায়। ২০০০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পত্রিকাটি নিষিদ্ধ করে।

bangladeshpost24.com

Previous articleস্বর্ণ চোরাচালানে বিমানের অনেকে জড়িত
Next articleফিজিক্যালি সবাই ফিট, মেন্টাল প্রবলেমটাই মেইন