অপারেশন ট্রোজান শিল্ড

এরপর তিন বছরে এই তদন্তে যুক্ত হয়েছেন ১৭টি দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নয় হাজার সদস্য। তারা একশ দেশের ১২ হাজার ডিভাইস থেকে দুই কোটি ৭০ লাখ মেসেজে নজরদারি করেছেন, অনুসরণ করেছেন তিনশর বেশি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের কর্মকাণ্ড।

এফবিআইয়ের সেই ‘অপারশেন ট্রোজান শিল্ড’ এখন বিশ্বজুড়ে অপরাধ ও অপরাধী শনাক্তের ক্ষেত্রে একটি বড় সাফল্যের খবর।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী- ইউরোপোলের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, অপারেশন ট্রোজান শিল্ডে এ পর্যন্ত আটশর বেশি অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আট টনের বেশি কোকেন, ১২ টন গাঁজা, দুই টন সিনথেটিক মাদক, আড়াইশ আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৫টি বিলাস বহুল যানবাহন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিতে আট কোটি ৮০ লাখ ডলারের বেশি জব্দ করা হয়েছে।

তদন্তকারীরা আশা করছেন, সামনে দিনগুলোতে তাদের এই অপারেশনে আরও সাফল্য ধরা দেবে।

বিকল্পধারার সংবাদ মাধ্যম ভাইস নিউজ প্রথম এই অভিযানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের নথির বরাত  একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, ‘একজন গোপন তথ্যদাতা’, যিনি সাবেক এক মাদক পাচারকারী, একটি নতুন এনক্রিপটেড ফোনসেট তৈরি করেছেন যেটায় এএনওএম বা এএনজিরোএম নামে একটি অ্যাপ যুক্ত করা হয়েছে।

২০১৮ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ফ্যান্টম সিকিওর এনক্রিপটেড স্মার্টফোন নেটওয়ার্ক ধ্বংস করে এর প্রধান নির্বাহীকে গ্রেপ্তার করার পর ওই গোপন তথ্যদাতা এফবিআইয়ের সঙ্গে যোগ দেয়।

বিবিসির প্রতিবেদনে এফবিআইকে সহযোগিতা করা সেই ব্যক্তির পরিচয় দেওয়া হয়েছে, যিনি অস্ট্রেলিয়ায় কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন। তিনি এই অভিযানের অন্যতম চরিত্র মাদক পাচারকারী হিসেবে অভিযুক্ত হাকান আইক। এএনওএম অ্যাপটি অপরাধী মহলে ছড়িয়ে দেওয়ায় কাজে তিনি সাহায্য করেন।

অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যমে ‘ফেইসবুক গ্যাংস্টার’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া আইক কারাদণ্ড মওকুফের পর তার ডাচ স্ত্রীকে নিয়ে তুরস্কে বসবাস করছেন।

পুলিশ এখন মনে করছে, আইকের উচিত এখন পুলিশের নিরাপত্তা হেফাজতে চলে যাওয়া, কারণ যেহেতু তিনি এফবিআইকে সহযোগিতা করেছেন, সেহেতু এখন তার জীবন বিপন্ন হতে পারে।

রয়টার্স লিখেছে, এক দশকের বেশি সময় ধরে অপরাধী চক্রগুলোর গোপন ও আস্থার যোগাযোগমাধ্যম ছিল ফ্যান্টম স্মার্টফোন নেটওয়ার্ক। পুলিশের নজরদারি এড়িয়ে যোগাযোগ করা ছাড়াও, বিরোধীদের ওপর হামলা, মাদক বেচাকেনা ও অর্থের লেনদেনের জন্য ওই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হত।

ফ্যান্টম নেটওয়ার্কের অন্যতম সুবিধা ছিল, ফোনসেট বেহাত হলেও অবস্থান গোপন রেখে যে কোনো জায়গা থেকে ওই ফোনের তথ্য মুছে ফেলা যেত।

পুলিশ ওই নেটওয়ার্ক ধ্বংস করে দেওয়ার পর সেই জায়গা দখল করতে আরও বেশ কিছু স্মার্টফোন নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে অপরাধীদের ‘নিরাপদ’ যোগাযোগের সুবিধা দেওয়ার জন্য। সেই সুযোগটিই নিয়েছে এফবিআই।

তদন্ত সংস্থাটি সিদ্ধান্ত নেয়, তারাই এবার অপরাধীদের জন্য নিজস্ব সেবা চালু করবে। তবে এক্ষেত্রে ডিভাইসগুলোতে একটি মাস্টার কি থাকবে যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদেরকে ওইসব ফোনসেটের মাধ্যমে ছড়ানো প্রতিটি বার্তা ডিক্রিপ্ট এবং তা জমা করার করার সুযোগ করে দেবে।

আর এভাবেই এএনওএম অ্যাপসহ নতুন ডিভাইস বাজারে আসে অপরাধীদের জন্য। যুক্তরাষ্ট্রে এই ফোন নেটওয়ার্কের সেবা নিতে ছয় মাসে দিতে হয় এক হাজার ৭০০ ডলার।

নতুন মডেলটি বাজারে ছাড়ার পর ওই বছরই এফবিআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয় অস্ট্রেলিয়ার পুলিশের। অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশের (এএফপি) কমিশনার রিস কারশ মঙ্গলবার সেই ঘটনা স্মরণ করে বলেন, “আপনারা জানেন, বেশ কিছু ভালো আইডিয়া কিন্তু বিয়ারের টেবিলেই আসে।”

আদালতের নথি থেকে জানা যায়, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে হাত মেলানোর পর ওই গোপন তথ্যদাতা, যিনি অ্যাপটির ডেভেলপার, তিনি তার বিশ্বস্ত বিপণনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যারা অস্ট্রেলিয়ার বাজারকে নতুন পণ্যের জন্য বেছে নেয়।

২০১৮ সালের অক্টোবরে সেখানে তারা এএনওএম অ্যাপযুক্ত ডিভাইসের পরীক্ষামূলক উদ্বোধন করে। অপরাধী থেকে তথ্যদাতায় পরিণত হওয়া ডেভেলপার তার বিশ্বস্ত বিপণনকারীদেরকে ৫০টি ডিভাইস দেন বিক্রি করার জন্য। মোটা আয়ের সুযোগ দেখে তারাও সেগুলো বিক্রি করতে রাজি হয়।

অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ ডিভাইসগুলোর মাধ্যমে লেনদেন হওয়া বার্তা ও ছবি পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। তারা দেখতে পায়, এএনওএম-এর এই পরীক্ষামূলক পর্যায়ে অ্যাপটি ব্যবহার করা হচ্ছে অপরাধমূলক কাজের জন্য।

মুখে মুখে নতুন ডিভাইস ও অ্যাপের কথা ছড়িয়ে পড়ে। দ্রুতই অন্যান্য দেশের অপরাধীরাও এএনওএম ফোন ব্যবহারের জন্য লাইন ধরে।

Previous articleআরাকানে ভারতের কালাদান প্রকল্প, আরাকান আর্মি ও বাংলাদেশ
Next articleফিলিস্তিনিরা স্বাধীন না হলে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে না বাংলাদেশ