অনলাইন ডেস্কঃ এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার নেহাল উদ্দিন পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের সচিব ও প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমানসহ বিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষক এবং পিয়নকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

প্রশ্নফাঁসের প্রমাণ পাওয়ায় চার বিষয়ের পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তন করে ছয় বিষয়ের প্রশ্নপত্র বাতিল করেছে দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ড। এ ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে কেন্দ্র সচিব ও সহকারী শিক্ষকরা প্রশ্নফাঁসের সুযোগ পেলেন? পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কমিটির সদস্যদের দায়িত্বে অবহেলা ছিল কিনা?

এরই মধ্যে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বৃহস্পতিবার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে সংশ্লিষ্টরা জানতে পেরেছেন, থানায় প্রশ্নপত্র সর্টিংয়ের সময় নেহাল উদ্দিন পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের সচিব ও প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান কৌশলে বাংলা বিষয়ের প্রশ্নপত্রের প্যাকেটে পরবর্তী বিষয়ের প্রশ্নপত্র ঢুকিয়ে নেন। এ ঘটনায় পুরো পরীক্ষা কমিটির দায়িত্বে অবহেলা রয়েছে বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। প্রশ্নপত্র সর্টিংয়ে পর্যাপ্ত সময় ও জনবলের অভাব, ট্যাগ কর্মকর্তাদের নজরদারির ঘাটতি, সর্বোপরি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কমিটির সতর্কতার অভাবে প্রশ্নফাঁস হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বোর্ড থেকে যে প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রে প্রশ্ন পৌঁছায়

জেলায় পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা একাধিক প্রধান শিক্ষক ও কলেজ অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাবলিক পরীক্ষা শুরুর কয়েকদিন আগেই শিক্ষাবোর্ড থেকে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসকের ট্রেজারিতে সব বিষয়ের প্রশ্নপত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ট্রেজারি থেকে সংশ্লিষ্ট উপজেলার থানায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রশ্নপত্র পাঠানো হয়। পরীক্ষার অন্তত পাঁচ-সাত দিন আগে উপজেলা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কমিটির সভাপতি কেন্দ্র সচিব বা তার প্রতিনিধি এবং ট্যাগ অফিসারের মাধ্যমে ট্রাংকে রক্ষিত প্রশ্নপত্রের প্যাকেটের সঙ্গে প্রশ্নপত্রের চাহিদা সঠিকভাবে যাচাইয়ের ব্যবস্থা করেন। কোনো গরমিল থাকলে ওই দিনই দুপুর ১২টার মধ্যে শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রককে লিখিতভাবে ফ্যাক্স কিংবা মেইলে জানানো হয়।

পরীক্ষা শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের ট্যাগ অফিসার কেন্দ্র সচিবসহ থানার লকার থেকে নির্ধারিত বিষয়ের প্রশ্ন নিয়ে পুলিশি নিরাপত্তায় কেন্দ্রে পৌঁছান। বোর্ড থেকে সেট কোড সংক্রান্ত মেসেজ পাওয়ার পর ট্যাগ অফিসারের উপস্থিতিতে নির্ধারিত সেট কোডের প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খুলে কেন্দ্রের কক্ষ পরিদর্শকদের কাছে বিতরণ করেন। পরীক্ষার দিন সঠিক প্রশ্ন সরবরাহ এবং সঠিক সেটের প্রশ্নে পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়টি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কমিটির সভাপতি নিশ্চিত করেন।

ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় প্রশ্ন সর্টিং করেছেন কারা?

জানা গেছে, ভূরুঙ্গামারী উপজেলার ছয়টি কেন্দ্রে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপক কুমার দেব শর্মা ১১ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে প্রশ্নপত্র সর্টিংয়ের দায়িত্ব দেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুর রহমানকে। ওই আদেশে চাহিদা অনুযায়ী প্রশ্নপত্রের সঠিকতা যাচাই করে ১৩ সেপ্টেম্বর তা ইউএনওকে জানাতে বলা হয়।
পরীক্ষা শুরুর অন্তত পাঁচ-সাত দিন আগে প্রশ্ন যাচাই করে চাহিদার সঠিকতা নিশ্চিত হওয়ার নির্দেশনা থাকার পরও ইউএনও পরীক্ষা শুরুর মাত্র একদিন আগে প্রতিবেদন চেয়েছেন। যা দায়িত্ব অবহেলার পর্যায়ে পড়ে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নেহাল উদ্দিন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান, অফিস সহকারী আবু হানিফ এবং পিয়ন সুজন মিয়া প্রশ্ন সর্টিংয়ের জন্য থানায় গিয়েছিলেন। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুর রহমানের ওপর ছয় কেন্দ্রের প্রশ্ন সর্টিংয়ের দায়িত্ব ছিল। কিন্তু আব্দুর রহমান তদন্ত কর্মকর্তাদের বলেছেন, ‘আমার একার পক্ষে বিপুল পরিমাণ প্রশ্নপত্র সর্টিংয়ের দায়িত্ব পালন করা কষ্টসাধ্য ছিল। সীমিত সময়ের মধ্যে শুধু প্যাকেটের ওপর স্বাক্ষর করতেই সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। ফলে নেহাল উদ্দিন পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কেন্দ্র সচিবসহ অপর সদস্যরা কখন কীভাবে প্রশ্নপত্র সরিয়ে নিয়েছেন, তা আমি বুঝতে পারিনি।’

দায় নিচ্ছেন না কেউ

ওই কেন্দ্রের ট্যাগ কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আদম মালিক চৌধুরী এবং উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা রায়হান হক। প্রতিদিন পরীক্ষা শুরুর আগে থানার নিরাপত্তা হেফাজত থেকে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সিলমোহরকৃত প্যাকেট পুলিশি পাহারায় কেন্দ্রে নেওয়ার দায়িত্ব ছিল তাদের। এরপর পরীক্ষা শুরুর আগ মুহূর্তে তাদের সামনে নির্দিষ্ট সেট কোডের প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খুলে প্রশ্নপত্র বণ্টন করা হয়। পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা কেন্দ্রে উপস্থিত থাকেন। এত নজরদারির পরও কেন্দ্র সচিব কীভাবে এক প্রশ্নের প্যাকেটে পরবর্তী এতগুলো পরীক্ষার প্রশ্ন নিয়ে গেছেন, তার সঠিক কোনও জবাব কেউ দিতে পারছেন না।

প্রশ্নফাঁসে নিজেদের দায়িত্বে অবহেলা ছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে সদ্য বরখাস্ত হওয়া উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুর রহমান বলেছেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। আমি প্রশ্ন বিতরণের দায়িত্বে ছিলাম না। আমি কোনও কথা বলতে পারবো না।’
প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলা রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ট্যাগ অফিসার ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আদম মালিক চৌধুরী বলেন, ‘দায়িত্বে অবহেলা আমি কোনোদিনই করিনি। এটি কীভাবে হয়েছে আমি বলতে পারবো না। এটা তদন্তাধীন। তদন্তের স্বার্থে আমি কিছু বলতে পারছি না।’

অপর ট্যাগ অফিসার উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা রায়হান হক বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন থানায় গিয়ে উপস্থিত থেকে প্রশ্নের প্যাকেট নিয়ে এসেছি। আমাদের সামনেই প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খুলে কক্ষ পরিদর্শকদের দেওয়া হয়েছে। সেসব প্যাকেটে অন্য কোনও বিষয়ের প্রশ্নপত্র ছিল না। কেন্দ্র সচিব কীভাবে পরবর্তী পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়ে এসেছেন তা আমরা জানি না।’

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কমিটি প্রশ্নফাঁসের খবর পেয়েছে কখন?

জেলায় কর্মরত একাধিক সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যমতে, ইংরেজি প্রথমপত্র পরীক্ষার পরই প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি তাদের নজরে আসে। এরপর ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষার আগের দিন রাতে তারা প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হন। পরদিন পরীক্ষা শুরুর অন্তত দুই ঘণ্টা আগে বিভিন্ন মাধ্যমে ইউএনওকে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা না নেওয়ার জন্য বলা হয়। কিন্তু ইউএনও বিষয়টি নিয়ে কোনও গুরুত্ব দেননি। ফলে বিষয়টি ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত গড়িয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে উপজেলা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কমিটির সভাপতি ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপক কুমার দেব শর্মাকে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি। প্রশ্নফাঁসের দায় পরীক্ষা কমিটি এড়াতে পারে কিনা এমন এসএমএস পাঠালেও উত্তর দেননি তিনি।

 

Bangladeshpost24.com

Previous article‘অশালীন’ গালিঃ ঢাকা দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে নোটিস
Next articleগ্রামের কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন যুবদলকর্মী শাওন