Home শিরোনাম নির্মল বায়ুর শহরে অসহনীয় শব্দদূষণ

নির্মল বায়ুর শহরে অসহনীয় শব্দদূষণ

শব্দদূষণ

বাংলাদেশ পোষ্ট ২৪ ডটকম: বায়ুদূষণ কমানোয় ২০১৬ সালে রাজশাহী শহর সারা বিশ্বে ছিল শীর্ষে। ওই বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) উপাত্তের ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর নির্মল বায়ুর শহর হিসেবে পরিচিতি পায় রাজশাহী। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালেও বাংলাদেশে সবচেয়ে কম বায়ুদূষণের শহর ছিল এটি।

অথচ সেই রাজশাহী এখন বিশ্বের চতুর্থ শব্দদূষণকারী শহর। শব্দের তীব্রতা নিয়ে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি ইউএনইপির (২০২২) প্রকাশ করা এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ‘ফ্রন্টিয়ারস ২০২২: নয়েজ, ব্লেজেস অ্যান্ড মিসম্যাচেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকায় শব্দের সর্বোচ্চ তীব্রতা ১১৯ ডেসিবেল। আর রাজশাহী শহরে ১০৩ ডেসিবেল।

এ তথ্যের সত্যতা উঠে এসেছে স্থানীয় একটি সংস্থার পরীক্ষাতেও। এতে রাজশাহী শহরজুড়ে মাত্রারিক্ত ও অসহনীয় শব্দের তীব্রতা পাওয়া গেছে। শব্দের এ তীব্রতা ১০০-এর বেশি না গেলেও এর কাছাকাছি পাওয়া যায়।

গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দিনব্যাপী শব্দের তীব্রতা মাপার কাজ করেন স্থানীয় বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মীরা। তাঁরা শহরের তালাইমারী মোড়, শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বর, বিসিক মঠ পুকুর, লক্ষ্মীপুর মোড় ও সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে শব্দের ঘনমাত্রা নির্ণয় করেন।

বাংলাদেশ শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ অনুযায়ী, শব্দের সর্বোচ্চ ঘনমাত্রার ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন এলাকাকে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। নীরব এলাকা, আবাসিক এলাকা, মিশ্র এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা ও শিল্প এলাকা। এই বিধিমালায় বলা হয়েছে, আবাসিক এলাকায় রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত শব্দের মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল এবং দিনের অন্য সময়ে ৫৫ ডেসিবেল অতিক্রম করতে পারবে না। বাণিজ্যিক এলাকায় তা যথাক্রমে রাতে ৬০ ও দিনে ৭০ ডেসিবেলে থাকতে হবে। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতের আশপাশে ১০০ মিটার পর্যন্ত নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয় এতে। এসব এলাকায় রাতে ৪০ ও দিনে ৫০ ডেসিবেল শব্দমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। শিল্প এলাকায় এ মাত্রা রাতে ৭০ ও দিনে ৭৫ ডেসিবেল এবং মিশ্র এলাকায় রাতে ৫০ ও দিনে ৬০ ডেসিবেল থাকার কথা বলা হয়েছে।

বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পরীক্ষায়—শহরের তালাইমারীতে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দিনে শব্দের মাত্রা ৮৪ ডেসিবেল পাওয়া গেছে। বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে পরিচিত শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বর, লক্ষ্মীপুর মোড় ও সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট এলাকায়ও শব্দের মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। এতে কামারুজ্জামান চত্বরে ৯০ ডেসিবেল, লক্ষ্মীপুর মোড়ে ৯০ ডেসিবেল, সাহেববাজার এলাকায় ৮৮ ডেসিবেল শব্দের তীব্রতা পাওয়া গেছে। শিল্প এলাকা হিসেবে পরিচিত বিসিক মঠ পুকুরে দিনে শব্দের তীব্রতা পাওয়া গেছে ৭৪ ডেসিবেল।

একই দিন অর্থাৎ গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত নগরের ওই পাঁচটি এলাকায় দ্বিতীয় দফায় পরীক্ষায় চালায় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটি। এতে তালাইমারী মোড়ে শব্দের তীব্রতা ৮৩ ডেসিবেল, শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বরে ৮৯ ডেসিবেল, বিসিক মঠ পুকুর এলাকায় ৬৬ ডেসিবেল, লক্ষ্মীপুর মোড়ে ৮৬ ডেসিবেল ও সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে ৮৪ ডেসিবেল পাওয়া যায়। দিনের চেয়ে রাতেও শব্দ দূষণের মাত্রা খুব একটা কম নয় বলে পরীক্ষায় উঠে আসে।

২০২০ সালের নভেম্বরে রাজশাহী নগরে ‘শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশীদারত্ব প্রকল্প’-এর আওতায় সিটি করপোরেশন ও পরিবেশ অধিদপ্তর যৌথভাবে কয়েকটি এলাকাকে নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালঘেঁষা লক্ষ্মীপুর মোড় এলাকা। বৃহস্পতিবারের পরীক্ষায় ওই এলাকায় উচ্চমাত্রার শব্দের তীব্রতা পাওয়া গেছে। তবে সংস্থাটি আবাসিক এলাকায় শব্দের মাত্রা পরীক্ষা করেনি। তাদের দাবি, রাজশাহীতে মিশ্র এলাকা নেই।

শব্দের ঘনমাত্রা পরীক্ষাকালে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ইকবাল মতিন। শব্দ পরীক্ষায় নেতৃত্ব দেন বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সভাপতি প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন খান। উপস্থিত ছিলেন অলি আহমেদ, শেখ ফয়সাল আহমেদ, ওবায়দুল্লাহ, শামসুর রাহমান, শরীফ, তারেক আজিজ প্রমুখ।

রাজশাহী শহরে দিন দিন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেড়ে চলেছে এবং বর্তমানে তা প্রায় ২ শতাংশের কাছাকাছি বলে উল্লেখ করেছেন প্রকৌশল জাকির হোসেন খান। তিনি বলেন, মাত্রারিক্ত শব্দের জন্য মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়, মেজাজ থিটখিটে হয়ে যায়, ঘুম অনিয়মিত হয়, রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়, হার্টের ক্ষতি করে। এমনকি দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও হ্রাস করতে পারে।

জাকির হোসেন খান আরও বলেন, তাঁরা একটি এলাকায় কিছু সময় পরপর তিনবার শব্দের মাত্রা পরীক্ষা করেন। পরে গড় হিসাব করা হয়।

শব্দের তীব্রতা কেবল মানুষের নয়, জীবযন্তু ও পশুপাখির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক ইকবাল মতিন। তিনি বলেন, যত্রতত্র হর্ন বাজানো বন্ধ করতে হলে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে।

ইকবাল মতিন আরও বলেন, শব্দের এ মাত্রা পরীক্ষা কিছুদিন পরপর করা দরকার। এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপও নিতে হবে।

 

bangladeshpost24.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here