ভারতের প্রায়ত সাংবাদিক বুবলি জর্জ ভার্গেস প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর তথ্য উপদেষ্টা (১৯৬৬-৬৯) থাকার সময়ে বঙ্গোপসাগর ও মিয়ানমারের কালাদান নদী পথে ‘সেভেন সিস্টার্স’ এর সাথে যোগাযোগের জন্য একটি ট্রানজিট প্রকল্প প্রস্তাব করেন। পরে এ প্রকল্পটিই কালাদান মাল্টিমডেল ‘ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ভার্গেসের প্রকল্পটি ছিল কলকাতা থেকে আরাকান পর্যন্ত সমুদ্র পথ, আরাকানের কালাদান নদী বেয়ে চিন প্রদেশ পর্যন্ত নদী পথ এবং সেখান থেকে মিজোরাম পর্যন্ত সড়ক পথ। ইন্দিরা গান্ধী মিয়ানমারের সেসময়কার সামরিক শাসক জেনারেল নি উইনকে প্রকল্পটির ব্যাপারে প্রস্তাব দেন। প্রকল্পটি রাখাইন ও চিন প্রদেশের উন্নয়ন ও বিদ্রোহ দমনে সহায়ক হবে ভেবে জেনারেল উইনও সেসময় প্রস্তাবটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনার আশ্বাস দেন। কিন্তু ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ভারত কালাদান প্রকল্পের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

স্বাধীনতার পর থেকে ভারত বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্কের কারণে ট্রানজিটসহ বিভিন্ন সুবিধা পায়। ২০০১ সালের পর এ সম্পর্কে কিছুটা ভাটা পড়ে।  বিএনপি ক্ষমতায় এসে ভারতের সাথে ট্রানজিট চুক্তি ও মিয়ানমার-বাংলাদেশ-ভারত গ্যাস পাইপলাইন চুক্তি বাতিল করে। মূলত সে থেকেই দিল্লী কালাদান প্রকল্পের ব্যাপারে পুনরায় আগ্রহী হয়ে উঠে। দীর্ঘ আলোচনার পর ২০০৮ সালে তারা মিয়ানমারের সাথে কালাদান প্রকল্পের চুক্তি সই করে ২০১০ সালে প্রকল্পের কাজ শুরু করে।

কালাদান মাল্টি মডেল ট্রানজিট প্রকল্পটি মূলত কলকাতা হলদিয়া বন্দর থেকে আরাকানের সিতওয়ে বন্দর পর্যন্ত ৫৩৯ কি.মি. সমুদ্র পথ, সিতওয়ে বন্দর থেকে কালাদান নদী বেয়ে মিয়ানমারের চিন রাজ্যের পালেতওয়া শহর পর্যন্ত ১৫৮ কি.মি. নৌপথ পথ, সেখান থেকে মিজোরাম রাজ্যের আইজাওয়াল পর্যন্ত ১৯৭ কি.মি. সড়ক পথ। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে কলকাতা থেকে আইজাওয়াল পৌঁছাতে মাত্র ৮৯৫ কি.মি. পথ পাড়ি দিতে হবে। বর্তমানে কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি করিডোর দিয়ে মিজোরামের আইজাওয়াল শহরে পৌঁছাতে ১৮৮০ কি.মি. পথ পাড়ি দিতে হয়। কালাদান প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে শুধু শিলিগুড়ি করিডরের উপর নির্ভরতা কমবে না, দূরত্ব ও ভ্রমণ সময়ও অর্ধেকের কমে নেমে আসবে। ধারণা করা হচ্ছে, আরাকানের পরিবেশ শান্ত থাকলে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হবে।

ভারত যে কারণে কালাদান প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে 

সীমান্ত নিয়ে চীনের সাথে ভারতের বিরোধ দীর্ঘদিনের। ভারতের আকসাই চিন অঞ্চল ও অরুণাচল প্রদেশকে চীন  নিজেদের এলাকা মনে করে। সেকারণে ভারত লাদাখ ও সেভেন সিস্টার্স নিয়ে চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকে। এ ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে থাকা শিলিগুড়ি করিডোর। ৬০ কি.মি. লম্বা ও ২২ কি.মি. প্রস্থের সরু এ করিডোরটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে সেভেন সিস্টার্সে যোগাযোগের একমাত্র পথ। চীনের দোকলাম থেকে যার দূরত্ব মাত্র ১৩০ কি.মি.। দুর্যোগপূর্ণ সময়ে চীনের চুম্বী ভ্যালিতে মোতায়েন থাকা সেনা দল  শিলিগুড়ি করিডোর নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলে পুরো সেভেন সিস্টার্স ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। নিরাপত্তা ও যোগাযোগের কথা চিন্তা করে ভারত কালাদান প্রকল্পের মাধ্যমে সেভেন সিস্টার্সে প্রবেশের বিকল্প পথ তৈরিতে উদ্যোগী হয়।

দ্বিতীয়ত, সেভেন সিস্টার্স এর কয়েকটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ভারতকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম-ইন্ডিপেন্ডেন্ট (উলফা-আই) ও ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ডের (এনএসসিএন) মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত। এ সংগঠনগুলো সাধারণত মিয়ানমার সীমান্ত বা দেশটির ভেতর থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। সম্প্রতি তাদের তৎপরতা কিছুটা হ্রাস পেলেও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ পরিবর্তন হলে সংগঠনগুলো নতুন উদ্দীপনায় জেগে উঠতে পারে। ভারত মনে করে, কালাদান প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে মিজোরাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

 

তৃতীয়ত, ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতিতে মেকং উপ-অঞ্চল (মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনাম) বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সে কারণে কালাদান প্রকল্পটি ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যন্ড ত্রিদেশীয় হাই ওয়ের সাথে সংযুক্ত করতে চায় যাতে দেশটি মেকং উপ-অঞ্চলসহ আসিয়ানভুক্ত অন্য দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি  ভূরাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করতে পারে।

চতুর্থত, চীন রাখাইনের কিয়াকফুতে গভীর সমুদ্র বন্দর, সিনো-মিয়ানমার তেল-গ্যাস পাইপলাইন ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে। ভারত চীনের এ কর্মযজ্ঞকে বঙ্গোপসাগরে কর্তৃত্ব স্থাপনের দীর্ঘমেয়াদী কৌশল মনে করে। কালাদান প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত বঙ্গোপসাগরের অবস্থান আরও সংহত করতে চায়। উল্লেখ্য, আন্দামান ও নিকোবার দ্বীপপুঞ্জে ভারতের ভারী সামরিক স্থাপনা ও বিমানঘাঁটি রয়েছে, যা মালাক্কা প্রণালী ও থাইল্যান্ডে প্রস্তাবিত ক্রা ক্যানেলে নজর রাখতে সক্ষম।

আরাকানকে ঘিরে মিয়ানমার, চীন ও ভারতের জটিল সম্পর্ক

মিয়ানমারের বড় সংকটে চীন বেশ খোলামেলাভাবে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। দেশটির অর্থনীতিতেও চীনের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। খালি চোখে মিয়ানমারকে চীনের ‘ক্লায়েন্ট স্টেইট’ মনে হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে দেশ দুটোর মধ্যে সম্পর্ক বেশ কৌশলী ও জটিল। মিয়ানমারের ব্যাপারে চীন কার্যত ‘ক্যারট অ্যান্ড স্টিক’ পন্থা অবলম্বন করে। অর্থাৎ, চীন মিয়ানমারের সামরিক ও বেসামরিক সরকারের সাথে সম্পর্ক রাখার পাশাপাশি বিচ্ছিন্নতাবাদী এথনিক সশস্ত্র গোষ্ঠিদেরও পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। উদাহরণ হিসেবে  মিয়ানমারের সবচেয়ে শক্তিশালী ও বৃহৎ এথনিক আর্মি ‘দ্য ইউনাইটেড ওয়া স্টেইট আর্মি’র কথা উল্লেখ করা যায়। চীন বেশ খোলামেলাভাবে এ সশস্ত্র দলটিকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করে। তাছাড়া  আরাকান আর্মি, মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মিসহ বেশ কয়েকটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠন চীনের কাছ থেকে অর্থ, অস্ত্র ও আশ্রয় পায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এথনিক আর্মিদের বেইজিং মূলত নেইপিডো-র (মিয়ানমারের রাজধানী) সাথে ‘বার্গেইনিং চিপ’ হিসেবে ব্যবহার করে। অন্যদিকে মিয়ানমারও চীনের ‘ক্যারট অ্যান্ড স্টিক’ পন্থা মোকাবেলায় ও একচ্ছত্র কতৃত্ব নিয়ন্ত্রণ করতে ভারত, জাপান ও রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক গড়েছে। উদাহরণ হিসেবে রাশিয়ার সাথে সামরিক চুক্তি ও জাপানের সাথে উন্নয়ন চুক্তির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। কালাদান প্রকল্প ও ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিদেশীয় হাই ওয়ে প্রকল্পও মিয়ানমারের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কৌশল মনে করা যেতে পারে।

আরাকানে ভারতের উপস্থিতিকে চীন কিভাবে দেখে? 

চীন আরাকানে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প- কিয়াকফু বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, গভীর সমুদ্র বন্দর ও সিনো-মিয়ানমার পাইপলাইনে আনুমানিক ৪২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। ভারতের কালাদান প্রকল্প থেকে কিয়াকফুর দূরত্ব আনুমানিক ১০৫ কি.মি.। স্বাভাবিকভাবে ধারণা করা যায়, বেইজিং আরাকানে ভারতের উপস্থিতি সুনজরে দেখবে না। এখন প্রশ্ন হতে পারে আরাকানে চীন ভারতকে কিভাবে মোকাবেলা করবে? এর উত্তর হতে পারে- ১. প্রচলিত অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কৌশল, ২. এসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার।

প্রচলিত অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কৌশল সম্পর্কে আমরা অবগত। কিন্তু চীনের এসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ারের ধরন কেমন হতে পারে? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন আরাকান আর্মি, জমি রেভুল্যুশনারি আর্মি, উলফা বা এনএসসিএন চীনের প্রক্সি হিসেবে ভারতের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে সক্ষম। প্রয়োজনে চীন এ প্রক্সিদের ব্যবহার করবে। ভারতসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমও দাবি করছে বেইজিং জমি রেভ্যুলুশনারী আর্মি, উলফা, এনএসসিএন সহ বেশ কয়েকটি বিদ্রোহী গ্রুপকে অস্ত্র দিয়ে সংগঠিত করার চেষ্টা করছে। চীন এ অভিযোগ সম্পর্কে কোন মন্তব্য না করলেও গ্লোবাল টাইমসের সম্পাদকীয় পাতায়- “চীন চাইলে বিদ্যমান চোরাচালানের রাস্তা দিয়ে বিদ্রোহীদের অস্ত্র সরবরাহ করতে পারে” বলে মতামত দেওয়া হয়। এ থেকে ধারণা করা যায় চীন প্রয়োজনে আরাকানকে ভারতের জন্য বেশ জটিল করে তুলবে।

আরাকান আর্মি ভারতের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতে পারে 

ভারতের সাথে আরাকানিদের নিকট অতীতের সম্পর্ক সুখকর নয়। এর মূল কারণ হচ্ছে দিল্লীর সাথে নেপিডো জেনারেলদের সুসম্পর্ক। নেপিডোর অনুরোধে ভারতীয় সেনারা আরাকানি বিদ্রোহীদের কখনো রাজনৈতিক বা সামরিকভাবে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয়নি। ১৯৯৮ সালে ভারতীয় সেনারা আন্দামানে ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টি অব আরাকানের (এনইউপিএ) ৭ জন শীর্ষ নেতা ও ৫০ জন বিদ্রোহীকে গ্রেপ্তার করে। ভারতীয় সেনারা এনইউপিএ-র ৭ জন শীর্ষ নেতাকে বিনা বিচারে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে খুন করে ও ৩৪ জন বিদ্রোহীদের বন্দি করে রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ অপারেশনের দায়িত্বে ছিলেন ভারতের কর্নেল ভি জে এস গ্রিওয়াল। তার এ অপারেশনের পর এনইউপিএ ও তাদের রোহিঙ্গা সহযোগী সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন আক্ষরিক অর্থে বিলুপ্ত হয়ে যায়। বর্তমান আরাকান আর্মি সেই এনইউপিএ-র উত্তরসূরী।

পরবর্তীতে আরাকান আর্মি সংগঠিত হলে ভারতীয় সেনা বা তাদের স্বার্থের উপর আক্রমণ করেনি। কিন্তু  ২০১৫ সাল থেকে ভারত ও মিয়ানমারের সেনারা আরাকান আর্মির ওপর একের পর এক সমন্বিত আক্রমণ চালায়। ২০১৮-১৯ সালে মিয়ানমার সরকারের অনুরোধ ভারতীয় সেনারা মিজোরামে আরাকান আর্মির ওপর আক্রমণ পরিচালনা করে ও সব ঘাঁটি ধ্বংস করে দেয়। তার প্রতিদান হিসেবে মিয়ানমারের সেনারা সাগাইং প্রদেশে ভারতের নাগা, মিজো ও আসামীয়া বিদ্রোহীদের ওপর আক্রমণ চালায়। ভারতের রক্তক্ষয়ী আক্রমণের পরও আরাকান আর্মি কৌশলগত কারণে আরাকান বা চিন প্রদেশে ভারতের কোন প্রকল্পে বাধা সৃষ্টি করেনি। ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে এসে তারা কালাদান প্রকল্পের ৫ জন ভারতীয় কর্মীকে অপহরণ করে। ডিসেম্বরে আরাকান আর্মি  দিল্লীকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়- আরাকানে কালাদান প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে তাদের কর দিতে হবে। আরাকান আর্মি কালাদান প্রকল্পের কাজে বাধা দেয়, কিন্তু কিয়াকফুতে চীনের কোন কাজে দেয়না, এ নিয়ে আরাকান আর্মিকে প্রশ্ন করলে তারা বেশ খোলামেলাভাবে বলে, “চীন আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছে, ভারত দেয়নি”।

আরাকান আর্মির নেতা জেনারেল তোয়ান ম্রেট নায়েংও বিভিন্ন সময় বিনিয়োগ ও বিভিন্ন অবদানের কথা স্মরণ করে চীনের প্রশংসা করেন। এ থেকে ধারণা করা যায়, ভবিষ্যতে আরাকান আর্মি ভারতের সাথে কঠিন দরকষাকষি করবে।

আরাকান আর্মি কেন গুরুত্বপূর্ণ?  

আরাকানে আরাকান আর্মির দিন দিন অপ্রতিরোদ্ধ হয়ে উঠছে। ২০০৯ সালে তরুণ ছাত্র নেতা তোয়ান ম্রেট নায়েং মাত্র ২৯ জন নিয়ে আরাকান আর্মি গঠন করে। বর্তমানে তাদের ১০ হাজার সক্রিয় যোদ্ধা রয়েছে। সাথে রয়েছে তাদের রাজনৈতিক উইং ইউনাইটেড লীগ ফর আরাকান (ইউএলএ)। সমগ্র আরাকান প্রদেশে আরাকান আর্মি ও তাদের রাজনৈতিক শাখা তুমুল জনপ্রিয়। রাজনৈতিক কৌশল, সম্মুখ যুদ্ধ, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, তথ্য যুদ্ধ ও কূটনীতিতে তারা চরম দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে। সাথে যুক্ত হয়েছে আরাকান আর্মির আর্থিক সক্ষমতা। ২০১৯ সালে তারা ‘রাখাইন পিপলস অথরিটি নামে’ একটি প্রটো-স্টেইট গঠন করে আরাকানে কর সংগ্রহ শুরু করে। বিভিন্ন প্রশাসনিক অফিস নিজেদের মতো করে পরিচালনা করার চেষ্টা করছে। দৃশ্যত স্থানীয় আরাকানিদের তাতে সতস্ফূর্ত সমর্থন রয়েছে। পাশাপাশি আরাকানের ব্যবসায়ীরা ও প্রবাসে বসবাসরত আরাকানিরা তাদের নিয়মিত আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। এখন  চীন বা তাদের প্রক্সি কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্ড আর্মি বা ইউনাইটেড ওয়া স্টেইট আর্মি যদি আরাকান আর্মিকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, আর্থিক সক্ষমতার কারণে তারা কালো বাজার থেকে স্ত্র সংগ্রহ করে নেপিডোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম হবে। এসব বিবেচনায় এ কথা নিরাপদে বলা যায়- আরাকান প্রশ্নে আরাকান আর্মি ও তাদের রাজনৈতিক সংগঠনকে উপেক্ষা করার সুযোগ কম।

আরাকান প্রশ্নে বাংলাদেশ ভূমিকা রাখতে পারে?  

আরাকানের সাথে বাংলা ও বাঙালির সম্পর্ক বেশ পুরনো। চতুর্থ শতাব্দীর পর থেকে এ অঞ্চলে যতগুলো রাজ্য গঠন হয়েছে, বলতে গেলে প্রতিটি রাজ্য গঠন ও উন্নয়নে বাঙালির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা ছিল। ৬ষ্ঠ-৮ম শতাব্দী এবং পরবর্তীতে ১৬ ও ১৭ শতাব্দীতেও চট্টগ্রামের ফেনী পর্যন্ত আরাকান রাজ্যের অধীনে ছিল। ১৪৩০ সালে শাহী বাংলার সহায়তায় রাজা নারামেখলা (মিন স মুন) ২৪ বছরের নির্বাসন থেকে আরাকানে ফিরে বাঙালিদের সহায়তায় ক্ষমতা দখল করেন। তার সাথে যাওয়া বাঙালিরাই রাজধানী ম্রক-উ ও আশেপাশের অঞ্চলগুলো আবাদী করে বসতি গড়ে তোলে। সেসময় আরাকান রাজ্য এতোই সমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয় ছিল যে পার্সিয়ান, আরব,পর্তুগিজ, ডাচ বণিকরা রাজধানী ম্রক-উ এবং তার আশপাশের শহরগুলোতে বাণিজ্যের জন্য ভিড় করতো। এ আরাকানেই বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র কবি দৌলত কাজী ও মহাকবি আলাওল তাদের অসামান্য কাজগুলো করেছেন । শুধু সাহিত্যেই নয়, রাজ্য পরিচালনার গুরত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন বাঙালি আশরাফ খান, লস্করই ওয়াজির শ্রী বড় ঠাকুর, প্রধানমন্ত্রী সমতুল্য পদে মগন ঠাকুর ও সৈয়দ মুসার মতো মানুষরা। বৃটিশ আমলতো বটেই ৭০ এর  আগ পর্যন্ত আরাকানে বাঙালির বিচরণ অনেকটা অবাধ ছিল।

আরাকান  আর্মি এবং তাদের রাজনৈতিক শাখা অতীতের যে সমৃদ্ধ আরাকান রাজ্যের স্মৃতিচারণ করে আরাকানিদের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখায় সে রাজ্য গঠন ও তৈরিতে বাঙালিদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। চট্রগ্রামের বাঙালিদের সাথে আরাকানিদের সম্পর্ক শুধু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকই নয়, আত্মীকও বটে। একাত্তরে বাঙালিরা ভয়াবহ গণহত্যার সম্মুখীন হলে আরাকানিরা তাদের দরজা বিনা সংকোচে উম্মুক্ত করে দেয়। আরাকানের সাথে ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণেই রোহিঙ্গাদের দুর্দিনে দুই হাত বাড়িয়ে দিতে বাঙালি কখনোই দ্বিতীয়বার চিন্তা করেনি। আরাকানিদের সাথে ঐতিহাসিক এ সম্পর্ক বাংলাদেশ চাইলেই ভুলে যেতে পারে না।

বাংলাদেশ চাইলে আরাকানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। রোহিঙ্গা সংকট বা বামারদের সাথে রাখাইনদের আলোচনা, রাজনীতি, অর্থনীতি সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ আরাকানে ভূমিকা রাখতে পারে। এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই যে  মিয়ানমারের জাতিগত সংঘাত বেশ জটিল। এ জটিল সংকটে বাংলাদেশকে ভেবেচিন্তে সিন্ধান্ত নিতে হবে। মিয়ানমারের অন্য প্রদেশে না পারুক, আরাকানে বাংলাদেশ ভূমিকা রাখতে পারে। আনুমানিক ১০-১৪ লাখ আরাকানি রোহিঙ্গা যারা চট্রগ্রামের ভাষায় কথা বলেন- তারা আমাদের ভূমিতে আশ্রয় নিয়েছেন। আরাকান প্রশ্নে আরাকান আর্মি ও তাদের রাজনৈতিক শাখাকে উপেক্ষা করার সুযোগ যেহেতু নেই, রোহিঙ্গা বা সীমান্ত ইস্যুতে ঢাকাকে শুধু নেপিডোর দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না।

আশফাক রনি, রাজনৈতিক বিশ্লেষক। বাঙালিত্ব গবেষণা উদ্যোগ (বিআরআই) এর সদস্য হিসেবে রয়েছেন।

Previous articleটুইটারে আসছে ‘সুপার ফলোস’
Next articleযেভাবে সফল হল অপারেশন ট্রোজান শিল্ড